ফলোআপ : ট্রাক চাপায় গর্ভ ফেটে বেরিয়ে আসা শিশুটি এখন ময়মনসিংহ মেডিকেলে

রওশন ঝুনু, ময়মনসিংহ থেকে : ত্রিশালে ট্রাক চাপায় মৃত মা রত্নার গর্ভ ফেটে বেরিয়ে আসা মুমূর্ষু শিশুটির অবশেষে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (এমএমসিএইচ) অবশেষে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে। মূমুর্ষু অবস্থায়, সোমবার রাতে তাকে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার দুর্ঘটনার পর ময়মনসিংহ শহরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে শিশুটি চিকিৎসাধীন ছিলো। হাত ভাঙা এবং জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে  ক্রমশো তার অবস্থার অবনতি হ’তে থাকে। এ অবস্থায় ময়মনসিংহবাসী সামাজিক মাধ্যমে তার উন্নত চিকিৎসার দাবি তোলে। যার প্রেক্ষিতে তাকে এমএমসিএইচ এ ভর্তি করা হলো।

শিশুটি সম্পর্কে জানতে চাইলে, এমএমসিএইচ এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. গোলাম কিবরিয়া ‘ওপেন প্রেস24’কে বলেন, শিশুটি জন্ডিস নিয়ে এসেছে। তার অবস্থা ভালো ছিলো না। এখন ‘শিশু নিকু ও স্ক্যানু বিভাগ’ এর আইসিইউ এ তাকে উন্নত চিকিৎসা দে’য়া হ’চ্ছে। তাকে রক্ত দেওয়া হয়েছে। জন্ডিসের কারণে তার রক্ত কমে গিয়েছিলো। এ ছাড়া ফটো থেরাপী এবং এন্টিবায়োটিক দেওয়া হ’চ্ছে, সেলাইন চলছে। ওর জন্য পাঁচ সদস্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তার অবস্থা আগের চেয়ে ইম্প্রুভড।

শিশুটিকে কী খাওয়ানো হ’চ্ছে, প্রশ্নের জবাবে গোলাম কিবরিয়া বলেন, তাকে অন্য প্রসূতি মায়ের বুকের দুধ এনে খাওয়ানো হ’চ্ছে।

আপনি শিশুটি সম্পর্কে কবে থেকে জানেন, জানতে চাইলে, পরিচালক বলেন, ১৮ জুলাই ‘২২ সোমবার রাতে, শহরের লাবিব হাসপাতাল (প্রাইভেট) এর মালিক মো. শাজাহান শিশুটিকে মেডিকেল  ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করান কিন্তু ১৬ জুলাই ’২২ শনিবার বিকেলে দুর্ঘটনার পর পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আমি সংবাদটি জানতে পারি। তখন থেকেই ইমার্জেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে খেয়াল রাখতে ব’লেছি, শিশুটি কখন আসে। বলা চলে, আমরা ওর জন্য অপেক্ষাই করছিলাম।

সুস্থ হওয়ার পর ওকে কার হাতে তুলে দেবেন? এই প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, সুস্থ হয়ে উঠলে তাকে আমরা ছেড়ে দেবো। শুনেছি, ডিসি দায়িত্ব নিয়েছেন। গতকাল শিশুটির খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য এডিসি জেনারেলকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন । তিনি বলেন,  মো. শাজাহান নিতে চাইলে আমরা তার  হাতেও তুলে দিতে পারি যেহেতু তিনিই শিশুটিকে ভর্তি করিয়েছেন। অথবা জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আলাপকালে পরিচালকের কক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন, এমএমসিএইচ এর উপ পরিচালক, ডা. মো. ওয়ায়েজউদ্দীন ফরাজী, সহকারী পরিচালক-প্রশাসন ডা. জাকিউল ইসলাম। তারাও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

শিশুটির অভিভাবক এবং নাম সম্পর্কে জানতে চাইলে, কর্তব্যরত ডা. মতিউর রহমান ভূঁইয়া (রেসিডেন্ট, নবজতক ও শিশু বিভাগ, এমএমসিএইচ) বলেন, মো. শাজাহান ছাড়া আমরা শিশুটির কোনো অভিভাবক পাইনি। ওর কোনো নাম নেই। ওকে ‘বেবি অফ রত্না’ নামেই খাতায় রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি জানান, বাচ্চাটির ডান হাতে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। তার ডান হাতের কুনুইয়ের ‍উপরে হাড়ে দুই স্থানে ভাঙা আছে। সড়ক দুর্ঘটনার সময় ভেঙেছে।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শিশুটি কার কাছে থাকবে, প্রশ্নের জবাবে মো. শাজাহান ‘ওপেন প্রেস24’কে বলেন, শিশুটি এখন সেলিব্রেটি।  হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তার দায়িত্ব নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক যদি আমাকে দায়িত্ব দেন, আমি ওর ভরণপোষণ করতে রাজী আছি।

আপনি কীভাবে শিশটিকে পেলেন, জানতে চাইলে মো. শাজাহান বলেন, দুর্ঘটনার দিন আমার গ্রামের পরিচিত এক মহিলা ও একটি ছেলেসহ একজন সিএনজিওয়ালা শিশুটিকে আমার কাছে নিয়ে আসে। শিশুটির বাবা মৃত জাহাঙ্গীর আমার প্রতিবেশি চাচাতো ভাই, মৃত মা’র নাম রত্না। আমার হাসপাতালে তার চিকিৎসা হচ্ছিলো। হঠাৎ করে সে বেশি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে ভর্তি করেছি। শিশুটির অভিভাবক সম্পর্কে জানতে চাইলে মো. শাজাহান বলেন, ওর বুড়ো দাদা-দাদি থাকলেও, আমিই সব দায়িত্ব পালন করছি।

পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট মেডিকেল বোর্ড: চেয়ারম্যান, ডা. তফাজ্জল হোসেন খান। সদস্য সচিব ডা. নজরুল ইসলাম (সহযোগী অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান- শিশু ও নবজাতক বিভাগ),  সদস্য তিনজন, (১) প্রফেসর ডা. এ এস এম লোকমান হোসেন (বিভাগীয় প্রধান, শিশু সার্জারি বিভাগ), (২) ডা. সাইফুল ইসলাম (সহযোগী অধ্যাপক, অর্থো সার্জারি), (৩) ডা. রাকিবুল হক খান (সহকারী অধ্যাপক, নবজাতক বিভাগ)।

শিশুটির সুরক্ষার জন্য হাসপাতালে দর্শনার্থীর ভেতরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৬ জুলাই ‘২২ শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে রাস্তা পারাপারের সময় চলন্ত ট্রাকের চাপায় ঘটনাস্থলে নিহত হয় মো. জাহাঙ্গীর ও রত্না দম্পত্তি এবং তাদের তিন বছরের কন্যা সানজিদা। ঐ সময় ট্রাক চাপায় গর্ভবতী মা রত্নার পেট ফেটে বেরিয়ে আসে এই শিশু।

এমএমসিএইচ এর সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. জাকিউল ইসলাম এর কাছ থেকে প্রাপ্ত মো. শাজাহান এর ঠিকানা: মো. শাজাহান। লাবিব হাসপাতাল, সদর, ময়মনসিংহ। স্থায়ী ঠিকানা, গ্রাম: অলহরি, পোস্ট: রাণীগঞ্জ, থানা: ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SuperWebTricks Loading...
Headlines