ছোট আপা, আমাদের আগলে রাখুন এভাবেই

সিলভিয়া পারভিন লেনি:

আরবিতে রেহানা শব্দের অর্থ সুগন্ধি, উর্দুতে বলে অরিগিন, মানে আসল। নামের অর্থের মতোই তিনি তার প্রতিভার সুগন্ধি ছড়িয়ে, আসল, নীতিবান, ধৈর্যশীল— এমন নানা গুনে গুণান্বিত একজন সফল মানুষ, একজন সফল মা, একজন রত্নগর্ভা। তিনি শেখ রেহানা, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি অন্যতম।

খুব সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ হলো— তিনি যেকোনো মানুষের সঙ্গে হয়ে উঠতে পারেন অসাধারণ। বঙ্গবন্ধু যেমন সব মানুষের হৃদয়ে রয়েছেন, তার জীবিত দুই মেয়েও তাই। দুই মেয়ের কথা বলেছি, কারণ আমাদের এই প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু পরিবারের এই দু’জনেরই সান্নিধ্য পেয়েছে।

শেখ রেহানা একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। রাজনীতি করতে হলে মন্ত্রী-এমপি হতে হবে বা দলের কোনো পদে বসতে হবে— এমন ধারণাই বহুল প্রচলিত। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারণাকে পাশ কাটিয়েও যে রাজনীতি করা যায়, তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ শেখ রেহানা। আর তাই দলীয় পদ-পদবীর বাইরে থেকেও তিনি দলের প্রয়োজনের দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন একনিষ্ঠভাবে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি বড় বোন শেখ হাসিনাকে প্রতিটি প্রয়োজনে, প্রতিটি ক্রান্তিকালে সাহায্য করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। আর এর মাধ্যমেই তিনি রেখে যাচ্ছেন তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার প্রমাণ। দলীয় পদ-পদবী ছাড়াই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদেরও সবসময় অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন ‘ছোট আপা’ হিসেবে পরিচিত রেহানা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল ক্ষমতালোভী দুষ্কৃতিকারী সেনাসদস্যের হাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সবাই নির্মম হত্যার শিকার হন। ওই সময় বেলজিয়ামে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা। জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালি অকৃতজ্ঞতার প্রমাণ দিয়েছিল। তবে মা-বাবাসহ পরিবার-স্বজন হারানো জাতির পিতার দুই কন্যা সেই অকৃতজ্ঞতার বদলি নিতে জিঘাংসায় আক্রান্ত হননি। বরং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা দেশকে আগলে রেখে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন উন্নতির শিখরে, অন্যদিকে ছোট বোন হয়েও শেখ রেহানা বড় বোনকে আগলে রেখেছেন মায়ের মমতায়, বাবার ভালোবাসায়। এ কারণেই শেখ হাসিনা স্বয়ং বলেছিলেন, ‘আমার পরিবার বলতে আমি, আমার ছোট বোন রেহানা আর আমাদের পাঁচ ছেলে-মেয়ে। এর বাইরে আমাদের কোনো পরিবার নেই।’

শেখ রেহানা ও অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক দম্পতির ঘর আলো করে এসেছে তিন সন্তান। তাদের তিন জনই নিজেদের মেধা ও কর্ম দিয়ে দেশকে গর্বিত করে যাচ্ছেন। বড় মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির একজন সংসদ সদস্য। ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত। আর ছোট মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক লন্ডনে কন্ট্রোল রিস্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল রিস্ক অ্যানালাইসিস সম্পাদক। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও শেখ রেহানার তিন সন্তানের কেউই কখনো কোনো বিতর্কে জড়াননি। বরং তারাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবসময়ই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন দু’হাত বাড়িয়ে। সন্তানদের মানুষ হওয়ার প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া শেখ রেহানা তাই একজন সফল মা-ও বটে।

ভালোবাসায় বড় বোনের জন্য যতই কোমল হোন না কেন, বাস্তবতা শেখ রেহানাকেও কখনো কখনো কঠোর করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ডুবতে বসা এই দেশকে টেনে তুলতে দেশে ফিরে আসেন, তখন তার দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় আর সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের দেখাশোনার ভার ছিল ছোট বোন রেহানার ওপরই। আর ওই সময়ই তাকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও কেবল জয় ও পুতুলের শিক্ষাজীবনের কথা ভেবে কঠোর হতে হয়েছে। শেখ রেহানা ওই সময় তাদের ভারতের নৈনিতালে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। “হাসিনা: আ ডটার’স টেল” প্রামাণ্যচিত্রে শেখ রেহানা এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, বুকে পাথর চাপা দিয়ে তিনি কাজটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তা না হলে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা ব্যাহত হতো।

২০০৭-২০০৮ সালে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আমলে জরুরি অবস্থা চলাকালীন গৃহবন্দি করা হয় শেখ হাসিনাকে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য সেটা ছিল ক্রান্তিলগ্ন। বিভিন্ন মহলের উসকানি আর চাপে ওই সময় দলে নেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিতে থাকে। শেখ হাসিনা গৃহবন্দি থাকায় তার পক্ষেও কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। ঠিক ওই সময়ই নিজের রাজনৈতিক দক্ষতার সর্বোচ্চ নমুনা দেখিয়েছিলেন শেখ রেহানা। বড় বোন শেখ হাসিনার পক্ষে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন তিনি। আজকের ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ প্রমাণ করে, শক্ত হাতেই হাল ধরেছিলেন তিনি। আর ইতিহাস বলেন, শেখ রেহানা ওই সময় এই প্রচেষ্টায় সফল না হলে কেবল আওয়ামী লীগই ক্ষতিগ্রস্ত হতো না, বাংলাদেশও হাঁটতে শুরু করত অন্ধকারের পথে। আজ থেকে ১০০ বছর পরও হয়তো ইতিহাসবিদরা ২০০৭-০৮ সালের সেই সময়ে শেখ রেহানার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করবেন।

শেখ রেহানাকে অনেকেই তুলনা করেন তার মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে। বঙ্গমাতা যেমন প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুকে মানসিক শক্তি জুগিয়ে গেছেন, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যস্ত বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নিরবে-নিভৃতে আগলে রেখেছিলেন পরিবারকে, ঠিক একইভাবে আলোচনার বাইরে থেকেও শেখ রেহানাও একইভাবে বড় বোন আর তার পরিবারকে আগলে রেখেছেন। একজন নারী, মা, সন্তান, বোন, রাজনীতিবিদ— প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি সফল।

আজ সেই শেখ রেহানার জন্মদিন। পঁচাত্তরের পর থেকে আজ অবধি লোভ-লালসা, পদ-পদবীর ঊর্ধ্বে থেকে বাংলার মানুষের জন্য অক্লান্তভাবে কাজ করে যাওয়া এই মানুষটির দীর্ঘায়ু কামনা করছি। মা-বাবার আদরের ‘মুন্না’, প্রাণপ্রিয় ছোট ভাই শেখ রাসেলের ‘দেনা আপা’, আর আমাদের ‘ছোট আপা’ শেখ রেহানা এভাবেই আমাদের অভিভাবক হয়ে আগলে রাখুন সবসময়— প্রত্যাশা শুধু এটুকুই।

লেখক: পরিচালক, রেডিও ঢোল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SuperWebTricks Loading...
Headlines